Thursday, 24 April 2014

নিজেকে, নিজের মনে (To know Oneself)

                        নিজেকে, নিজের মনে


পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় মানুষের মন। ‘কখন’, ‘কেন’, ‘কি’, করে সেই মানুষটা নিজেই হয়তো বুঝে উঠতে পারে না। আবার বোঝার বাইরে ও কখনও  অনেক কিছু থেকে যায়, যেখানে মানুষের নিজের ও নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
       ‘অদ্ভুত’ কথাটা হয়ত বার বার ব্যবহার হয় সেই কারণে!
খুব শক্তিশালী মন যাঁদের আয়ত্তে, কঠিন নিয়ন্ত্রণে মনের চলাফেরা যাঁদের কাছে খুব সহজ কিছু, কখনও কখনও সেই তাঁরা ও বেমালুম হতবাক হয়ে যান নিজের মনের কাছে, আমাদের চারিদিকে এমন মানুষ ও কতশত!  
        অবশ্য একেবারে বড় বড় মানুষ অর্থাৎ সাধক-মহাপুরুষ-মহাজ্ঞানী যাঁরা তাঁরা আমাদের সকলের নমঃস্য, তাঁদের কথা বলছি না।
        আমি কেবল এই আমাদের মত সাধারন মানুষ, যারা নিজেরাই নিজেদের চিনেছি ঢের ভালো ভাবি, সেই তাদের কথাই বলছি। আমরাই তো প্রায়ই বলি ‘আরে বাবা আমি আমার মনের কথা জানবো না? বুঝবো না?’ সত্যিকথা বলতে গেলে বলতে হয়, ‘না’! বুঝি না! জানি না! সত্যি সত্যি আমরা কখনও কখনও আমাদের এই সহজ সাদা সিধে সরল মনটাকে চিনতে পারি না, ভীষনভাবে বুঝতে ভুল করি!
          কি ভাবছেন, কেন আবোল তাবোল বকছি? না মশাইরা আবোল তাবোল নয়! এই ‘মন’টাই যে প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সে বিষয়ে তো আমার সঙ্গে সহমত হবেন? আচ্ছা একটা ছোট্ট নির্ভেজাল সহজ প্রশ্ন রাখি আপনাদের কাছে, তাড়াহুড়ো করে দিতে হবে না জবাব, সত্যিকথা! ভেবেচিন্তে ধীরে সুস্থে উত্তর খুঁজুন-‘আপনারা নিজেদের জন্য সঠিক ভাবনাটি ভেবে ফেলতে কত সময় নেবেন? নিজের মনটাকে কতটা সঠিক ভাবে চিনেছেন? কখনও কখনও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নিজের নিজের মনকে কতটা গুরুত্ব দিতে পারেন? কখনো কখনো কি কোনো ঘটনার পরে নিজের বিচার নিজের হাতে করেন? যদি করেন ও তাহলে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে কত সময় লাগে?’
           আহা হা, রাগ করবেন না দয়া করে! ভাবছেন, কেন আমি এই সব উল্টো পাল্টা কথা-প্রশ্নে বৃথা সময় কেন নষ্ট করছি আপনাদের?
           না না, মাপ করবেন, আমি আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে আসিনি এখানে, আমি শুধু আপনাদের প্রত্যেকের মনটাকে একটু গুরুত্ব দিতে অনুরোধ করছি, নিজের মূল্যবান ‘মন’টিকে চিনতে ভুল করবেন না, কেবল এই অনুরোধটুকু রাখতে চাই আপনাদের কাছে। নিজেকে চিনুন যতটা চেনেন তার থেকেও বেশী করে।
           আমি আমার নিজের অভিমতটা একটু বলি আপনাদের কাছে, এই আমার নিজের কোনো কোনো কাজে কখনও কখনও দেখেছি, যা ভেবেছিলাম তা না করে কেমন একটা অন্য কিছু করে ফেললাম! কেন করলাম তার কোনো সদুত্তর নিজের কাছে মেলে না! যা করব ভেবেছিলাম তা তো নিজেই ভেবেছি, যা করলাম তা ও তো নিজেই করলাম কিন্তু কেন এমন অন্যকিছু হয়ে গেল? জানি না! সত্যি আমি নিজে বলতে পারবো না কেন এমন হয়!
           জানি, বলবেন ‘নিজের উপর সামান্যতম নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এমন হয়!’ মেনে নিচ্ছি আপনাদের কথা নির্বিচারে। হয়, এরকম ও হয়। এমনটাই স্বাভাবিক! কিন্তু আমি তো সাধারণ ভাবে বলছি না, যখন নিজের মনের জোর থাকে সাংঘাতিক ভালো, যখন নিজের উপর দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকে তখনও কিন্তু এমন অস্বাভাবিক ঘটনা ও ঘটতে পারে!
           আমার জীবনে অনেকবার ঘটে যাওয়া এই রকম অনেক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তো আমার আপনাদের সামনে আসা।       
           ‘এমন কখনও হয় না আপনাদের?’ ভুলে গেছেন? নয়তো খেয়াল করেন নি! হয়তো এইসব সাধারণ বিষয়ে নষ্ট করার মত সময় খরচ করতে চাইছেন না! কিন্তু জগতে হাজার হাজার মূল্যবান চিন্তা ভাবনার মধ্যে নিজের ‘মন’টাকে একটু মূল্য দেওয়া যায় না কি?
           এইজন্যই তো আমার প্রশ্ন রাখছি এখানে, ‘আপনার নিজের মন কত খানি আপনার নিজের নিয়ন্ত্রণে চলে?’
           ভাবুন একবার, পৃথিবীতে কতশত মূল্যবান কাজ রয়েছে, আপনার কতকিছু ভালো ভালো কাজ করার ইচ্ছে, করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই কত ভাল কাজ, কিন্তু আপনার নিজের ‘মন’কে চিনেছেন, জেনেছেন? সে কতটা আপনার স্ব-নিয়ন্ত্রণে?
অথবা পুরোপুরি আপনার ‘মন’টা আপনার কাছেই আছে তো? সামান্য ভেবে বলুন!

                    ----------- 

Monday, 24 February 2014

স্মৃতিপথে মাসাইমারা (Memories to Masaimara)

      আমরা তখন ঠিক করেই নিয়েছিলাম ভারতে চলে আসবো, আপাতত নাইরোবি ফেরার কথা
        ভাবছিনা, অতএব মাসাইমারা থেকে একবার ঘুরে আসা যাক।আমরা নাইরোবির ব্রুকসাইডে
        থাকতাম, ছেলের বয়স তখন দশবছর, অসওয়াল স্কুলে ক্লাস ফোরের ছাত্র।
                 দুর্গাপূজা হয়ে গেছে, দেওয়ালী উৎসবও সারা, প্রবাসে বসবাসকালে এইসব উৎসব
        বড়ই প্রাণস্পর্শী, মন উচাটনের, দেশের জন্য প্রাণের ভিতর উথালিপাথালি।যা দেশে থাকাকালীন
        এইভাবে বোঝা যায় না।তিনজনের মধ্যে আমাদের দুইজনের মনটা বেশী ভারাক্রান্ত।ছেলের তো
        নাইরোবির বন্ধু, পরিবেশ, উৎসবে খুশীতে ভরপুর থাকার বয়স।    
                 অতএব সব ঠিকঠাক করে নভেম্বরের মাঝামাঝি চললাম মাসাইমারা।তিনজনেই
        টগবগ ফুটছি উত্তেজনায়।রাস্তা দিয়ে চলেছি, মনে হচ্ছে আমরা কোনো স্বর্গরাজ্যের মধ্যদিয়ে
        চলেছি, অপরূপ দৃশ্যাবলি মন উড়ে চলেছে সমানে পাল্লা দিয়ে।
                 আমাদের রথের সারথি আফ্রিকান, বেশ মজার মানুষ।কত গল্প, আমাদের দেশের
        কথা আমরা শতমুখে বলছি, ড্রাইভারসাব শুনছেন মন দিয়ে, জানার আগ্রহ দেখে আমরাও..
        ফোয়ারা।আবার উনার মুখে ওইদেশের নানান কথা শুনছি।
                  বেশ চওড়া রাস্তা, হুহু গাড়ী ছুটে চলেছে, স্পীডমিটারে চোখ পড়তেই চোখ
        ছানাবড়া।ওরে বাবা!
                   পথের দুইদিকে একদুজন পসরা সাজিয়ে বসে,সেও যেন ছবি আঁকা।নানা
        উজ্জ্বলরঙের সব্জী।
                  বেশ কিছুদুর যাওয়ার পর, দুইপাশে সাইনবোর্ড।পশুদের যাওয়ার রাস্তায়,
        স্পীড কন্ট্রোল করতে হয়, সবাই মেনেও চলেছে নিয়মকানুন।কেউ নেই যদিও লক্ষ্য করার।
                  হঠাৎ মাঠে দেখছি ছাগল-গরুর মত বেশ কারা চরে বেড়াচ্ছে।
        ভালো করে তাকাই, ওরে বাবা জেব্রার দল।ছেলে নিয়ে গাড়ী থামিয়ে দৌড় মাঠে।ক্লিক ক্লিক।
        আবার চলেছি, গাড়ী রীতিমত ভয় ধরানো স্পীডে।
                  মাঝখানে লাঞ্চ নিলাম, সে সময় আফ্রিকান সাম্বানাচ পরিবেশিত হোল।
       অবাকচোখে দেখছি লম্ফঝম্প, মুখে আর খাওয়ার ঢুকছেনা।হাত থেমে যাচ্ছেতো দেখে দেখে।
                 আবার দৌড়।এবাবা কোথায় এলাম এটা!দিগন্ত বিস্তৃত এই সেই রিফ্টভ্যালী?
       চক্ষু সার্থক।একটা দুটো মাসাই বাচ্চা, বেশ কিছু গরু,ভেড়া নিয়ে চলেছে, সঙ্গে দুচারটে
       পালোয়ান তাগড়াই কুকুর।
                 আমরা অবাকচোখে, ওরাও।এতটুকু বাচ্চাগুলো পিটির পিটির তাকায়।মায়া
       লাগে, আহারে এরা এত দায়িত্বের কাজ পারবে?চারদিকে সিংহ, হায়না হিংস্র জন্তু!
                 ড্রাইভারসাব বললেন ওইযে কুকুরগুলো ওরাই রক্ষা করবে।মানলাম কিন্তু
       ওই কিন্তুতেই তো বাঙালী মায়েরা আঁচলছাড়া করেন না।আমার ছেলেটা কে দেখছি, দেখছি
       ওদেরকে!হঠাৎ দৃষ্টি আকর্ষন করলেন কর্তা, ওটা কি?মাউন্ট লঙ্গোনট্!
                  একশ বছর ঘুমিয়ে আছে আগ্নেয়গিরি, জাগতে পারে যে কোনোদিন।
       চললাম ভয়ে ভয়ে, বাপরে এখন যেন জাগিসনা বাপু।ছেলে ফটাফট বলে, ‘বেশ মজা হবে,
       আগ্নেয়গিরিটা জেগে উঠলে’।আঁতকে উঠি, ওরে থাম থাম।
                  দুপুর শেষ, এসেগেছি প্রায়।ওরে বাবা ওই কালো কালো কি?
      একগাদা কালো পিঁপড়ের মত কিলবিল করছে ওয়াইল্ড বিস্ট।হঠাৎ হঠাৎ লম্বাগলা জিরাফ,
      বাচ্চা দুএকটা, দুচারজনের দল।হঠাৎ একটা অস্ট্রিচ মহারানীর মত হেলতেদুলতে রাস্তা পেরোলেন।
      পেছনে চললো হাল্কা পালক গজানো একদল অস্ট্রিচবাচ্চা।অপেক্ষায় রইলাম ওদের যাওয়ার।
                 আর মহারাজ কই? তাকাচ্ছি এদিক ওদিক।
      পৌঁছে গেলাম রিসোর্টে।ঢুকতেই একদল মাসাই ড্রেস পরা ছেলে ওয়েলকাম জানালো।রিসেপশনে
      রাজকীয় অভ্যর্থনা।সবাই আফ্রিকান এমপ্লয়ী, বেশ অমায়িক আন্তরিক হাসি।প্রাণ জুড়িয়ে গেল
      প্রথমেই।কোনো রকমে লাগেজ রেখে বেরিয়ে পড়লাম সাফারী ড্রাইভে।দিন থাকতে থাকতেই।
                 এখন রাতে বারণ আছে, আগে নাকি নাইট সাফারী ছিল।
      আমাদের গাড়ীর ওপরে হুডখোলা, চলেছি একেবারে তানজানিয়ার বর্ডার যেদিকে।হঠাৎ দেখি
      পিলপিল করে যেমন কালো পিঁপড়ে দৌড়োয় তেমনি বিস্টগুলো দৌড়চ্ছে, এদিক থেকে ওদিকে।
       আবার ওদিক থেকে এদিকে।কি ব্যাপার? বাপরে চক্ষু ছানাবড়া এবার সঙ্গে হাঁ!
       দশবারটা সিংহীর দল তাড়া করছে তাদের।আমাদের গাড়ীর গা ঘেঁষে চলগেল
       দুএকজন মহারানী।ঘুরেও দেখলনা আমাদের, সামান্য মানুষ ছোঃ।কয়েকটা বাচ্চাও
       রয়েছে দলে।তাদের ট্রেনিং পিরিয়ড চলছে, দুএকজন দুষ্টুমী করছে ধমক খাচ্ছে
       মায়েদের কাছে।সামনে কোনো মহারাজাদের দেখলামনা।ড্রাইভারসাব অনেক জানেন,
       বললেন পশুরাজ শিকার করেননা খুব একটা, কিন্তু আগেই খাওয়াটা সারেন।
                 তারপর বাঁচলে রানীরা পাবেন।তাদের পেটগুলো ভরে গেলে হায়েনা
       আসে দলবেঁধে।তারপরে শকুন আসে।এইভাবে যে যার খাওয়ার খায়।শৃঙ্খলতায়।
                 জেব্রা বাচ্চাগুলো কি অপুর্ব দেখতে, আবার সেই মায়া।হরিণ,বিস্ট
       সবাই বাচ্চা সামলে নিয়ে চলছে সাবধানে।
                তার মধ্যেই হাতিদের দলও বাচ্চা মাঝখানে রেখে চলেছে বীরদর্পে।
       ব্ল্যাক রাইনো দেখলাম, দেখলাম ওয়াইল্ড বাফেলো।ড্রাইভার এদেরকে ভয়ে সামলে
       চললেন।সেকি! আমরা তো মোষের দুধ খাই।মোষগুলো কলকাতার রাস্তায় ফুটপাথে
       বাঁধা থাকে।চমকে উঠলেন ড্রাইভার।সেকি! তাহলে চমক দিতে পারি আমরাও।
                আমরা টেন্ট হাউসে ছিলাম।থ্রিস্টার ফেসিলিটি।
       আমাদের ঘরের থেকেও বেশী স্বাচ্ছ্ন্দ, সাজানো।
                 ডিনারের পর ফায়ার প্লেসে বসে কফি নিলাম, বেশীরভাগ বাকিরা
       ইউরোপীয়ান।ইন্ডিয়ান দেখে আলাপ জমাতে আসছে সবাই।ছেলেতো টকাটক জবাব
       দিচ্ছে, কর্তাও স্বচ্ছন্দ, আমি ভালো করে শুনে বুঝে ধীরে ধীরে কথা বলছি।এদের
       সঙ্গে কথা বলব অত জ্ঞান আমার ইংরেজীতে নাকি!
                 রাতে অনভ্যস্ত বিছানার অতিরিক্ত কোমলতায় ঘুম আসে?
       ছাড়াছাড়া ঘুম, পাশেই কত পশুদের কতরকমের আওয়াজ।একেবারে মাসাইমারা
       জঙ্গলের মধ্যে।ভাবতেও বুক দুরুদুরু।
                  ভোরে ‘জাম্বো’ বলে আফ্রিকান গলা আন্তরিক ভাবে ঘুম থেকে তুলে
        চলেছে সকলকে।আবার তো জঙ্গলে সাফারীতে যেতে হবে।
                  বাইরে বেরোতে গিয়ে টেন্টের পর্দ্যায় হাতদিয়ে ছিটকে ভেতরে ঢুকলেন
        কর্তাবাবু।ওরে একদম বাইরেই সিংহ! সেকি! চমকে উঠলাম সবাই।আমরা বেঁচে আছি?
                   এদিকে লোকজনের গলাও পাচ্ছি।কই কেউতো সেরকম কিছু বলছেনা।
        ভালো করে কান পেতে শুনলাম।সত্যিতো আওয়াজ তো সাংঘাতিক জোরে।কিন্তু লোকজন!
        তারপর আরো কান পেতে শুনি।ধীরে ধীরে সাহস করে বাইরে এলাম।        
                   ও হরি!পাশের টেন্টে এক ইউরোপীয়ান ভদ্রলোক বারান্দায় চেয়ারটেবিলে
        বসে ওই রকম নাসিকাগর্জন সহযোগে নিদ্রামগ্ন।
                   হাসি ধরে রাখা দায়, আমাদের সাহসী বীরপুরুষের।
        আজ এখানেই থামি।বাকি কথা আবার কখনও