মুখোমুখি
পূর্ণপ্রভা ঘোষ
‘খুব যে ভেবেচিন্তে কথা বলি
আমি, তা নয়! আসলে আমি কথা বলতে ভালোবাসি। কারণে অকারণে সারাক্ষণই কথা বলি। শ্রোতা
সামনে থাকলে ভালো, নইলে কুছ পরোয়া নেহি। দূরের মানুষ, অলক্ষ্যের মানুষ, চেনা
কিম্বা অচেনা! এমনকি গাছ, ফুল, পাখি, গরু, কুকুর যে কেউ হোক, আমি কথা বলার জন্য
উদগ্রীব থাকি। নিশ্চয়ই পাগল ভাবলেন? উঁহু, একেবারেই না।’ হাতে তুলি, ক্যানভাসে
স্থিরদৃষ্টি।
অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছি আমি। হেসে উঠলেন
শিশুসুলভ সহজ ছন্দে। অপার্থিব এক আলোর ঝিলিক ছুঁয়ে গেল চারপাশে। বলে চলেছেন বিরামহীন, অনর্গল। হয়ত অকেজো কথা তবুও
শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। আমি মুগ্ধ চোখে
দেখছিলাম চারপাশ আর কানপেতে শুষে নিচ্ছিলাম
সমস্ত শব্দরাশি।
গতকাল এসেছি আমরা। সংখ্যায় হাফডজন, ভ্রমণপিপাসুর দল। সারাবছর কর্মচক্রে কলুর
বলদের মত চোখ কান বন্ধ করে দৌড়োতে থাকি। টার্গেট, টার্গেট! আরও বেশী, আরও বেশী।
চাহিদারও শেষ নেই।
তবে হাজারও বাধা সরিয়ে এই তিনটে দিন আমরা
দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ি প্রকৃতির আঁচল ছুঁতে। মাটির টান, সবুজের মোহ, নীলাকাশের উদারতা। গাধার খাটুনি খাটা কয়েকটি মার্কেটিংয়ের চাকর। আমাদের দলে নিজেদের পরিবারকেও রাখি না। আর যারা
এখনও যুগল হতে পারেনি তারা তো একাই।
আমরা খুব ভালো বন্ধু। যদিও প্রকৃত বন্ধুত্ব
কিছুতেই সম্ভব নয়, জানি। তবুও একসঙ্গে গলা মিলিয়ে হা-হা হেসে উঠি, গ্লাসে গ্লাস
ঠেকিয়ে চিয়ার্স করি, অন্যের বউয়ের বেঢপ স্ট্যাটিস্টিকস্ জেনেও ঝুটমুট প্রশংসা করি,
আমরা পাক্কা অভিনেতা। বন্ধুত্বেরও অভিনয় করি।
যাক গে সেসব! বছরে এই তিনটে দিন মিথ্যে
বন্ধুত্বের জন্য উৎসর্গ করি। কাল সারাদিন হোটেলের লনেই কাটিয়েছি। দলে গোটা দুয়েক বাচ্চা আছে, তারা দুদুভাতু। মায়ের আঁচল থেকে
সবে বেরিয়েছে, মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মিলে উড়ে বেড়াচ্ছে আনন্দে। কোনো বাধা নেই।
এইটুকু স্বাধীনতার লোভেই তো বেরোনো।
আজ সকালে সবাই সাইট সিইংয়ে গেছে দলবেঁধে।
আমি একা দলছুট। শরীর খারাপের মিথ্যে নাটকে ওরা বিশ্বাস করে আমায় ছেড়ে দিয়েছে।
ঝাঁকের কই হওয়ার যন্ত্রনা থেকে রেহাই মিলেছে আমার। গতকালই দেখেছি। অপেক্ষায় ছিলাম, কৌতুহল নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে এইটুকু
মিথ্যের আশ্রয় নিতেই হল।
হোটেলের অদূরেই, ছোট্ট একটা মাটির চালাঘর।
উন্মুক্ত দাওয়াতে দশ বাই দশের বিশাল ক্যানভাস। শিল্পকর্মে আত্মনিমগ্ন শিল্পী,
দাঁড়ালাম এসে নিঃশব্দে। একবারও ঘুরে তাকালেন না। কিন্তু অভ্যর্থনা জানালেন।
তারপর থেকেই বিরামহীন কথার স্রোত। হাতের
তুলি চলছে অক্লান্ত। রঙের ভারসাম্য রেখে এগোচ্ছে ছবিটা, নির্ভরযোগ্য প্রাণময়তার
সন্ধানে।
ঘন্টা পাঁচ ছয় সময় কিভাবে পেরিয়ে গেল। একবারও আমার মুখে চোখ ফেলেননি শিল্পী। অথচ কতকথাই হচ্ছে
দুজনের। পরিচয়, পছন্দ অপছন্দ, ভালো লাগা মন্দ লাগা। আমাদের দলের সবাই সন্ধের আগে
ফিরবে না। হাতে এখনও ঘন্টা খানেক রয়েছে।
ঘুরে দাঁড়ালেন শিল্পী, চমকে উঠলাম।
হাল্কা নরম মায়াময় আলো পড়েছে ছবির উপর।
পশ্চিম আকাশে সূর্য এখনও বিদায় নেয়নি। মিটিমিটি হাসছেন শিল্পী। খুব চেনা লাগছে,
কিছুতেই মনে করতে পারছি না। হাল্কা দাঁড়িগোঁফের আড়ালে হাসিটা ভীষন আকর্ষনীয়।
কিন্তু কে? আমার খুব চেনা, খুবই চেনা। অথচ স্মৃতিটা এইমুহূর্তে বিশ্বসঘাতকতা করছে।
কিছুক্ষণ মাথা ঘামিয়ে হাল ছেড়ে দিলাম। স্রষ্টাকে
ছেড়ে সৃষ্টির দিকে তাকাই। ওকে? মাথাটা বোঁও করে চক্কর দিল! টাল সামলাতে না পেরে
পড়েই যাচ্ছি। হাত বাড়িয়ে পতন আটকে দিলেন উনি। রক্ষা পেলাম ধরনীতলে শয্যা গ্রহণের আগে। কিন্তু? এসব কি ঘটছে?
ক্যানভাস জুড়ে প্রমাণ সাইজের আমি, হ্যাঁ,
আমিই তো। কম বয়সের হাসিমাখা মুখ। কবে এমন হাসতাম? কবে? অতীতে? হাসতে জানতাম?
পারতাম? কিন্তু আমাকে কিকরে আঁকলেন? আমায় চেনেন? তাহলে উনি কে?
রঙতুলি হাতে নিয়ে তাকিয়ে আছি অপলকে, আমিই
তো! হাসিমুখেই। ভবিষ্যতের আমি! কয়েক বছর পেরিয়ে!
----------