Wednesday, 7 March 2018

Ek natun prithibee (A new wish)


                                  এক নতুন পৃথিবী
                                   পূর্ণপ্রভা ঘোষ
                                                                                                      

           কাশে দ্যাখো, ওই কত আলো। চারপাশে ঝলমলে আলোর উৎসব। তবুও যে অন্ধকার যায় না। মানুষের মনের সমস্ত কালোদিক মুছে দিতে চাইলে কতগুলো সূর্যের দরকার কে জানে!
           কোকিলের কুহুতানে কান ঝালাপালা! এত চেঁচায়, এত্তো চেঁচায়, কই ওর গলায় তো এতটুকু স্বরের বিভ্রাট ঘটে না! সপাটে পঞ্চম থেকে তারসপ্তকে আরোহণ, এক্কেবারে নিখুঁত সুর। ওরা কার কাছে তালিম নেয় কে জানে!
           গাছে গাছে রঙের বন্যা! নানান ফুলের নানান রঙ। লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি, বেগুনী রঙের প্রতিযোগিতায় কত যে রঙ, ওরা সবাই প্রাণ রেখেছে পণ বুঝি এখন তো পলাশ, শিমুলেও রঙের বন্যা। শীতের রুক্ষতায় বিবর্ণ রঙহারা হয়ে সবুজ সতেজ পাতারা ঝরে গিয়েছে পত্রবিহীন শুকনো ডালপালায় তবুও কোন জাদুবলে জাগে এমন রঙের প্লাবন। বুঝি, সকলের সুখস্বপ্ন, আশা-ভরসা সাজিয়ে দিয়েছে ওরা থরেথরে। কে জানে, কোথায় পায় ওরা এত রঙ!

           এইসব হাজারও ভাবনা বেশ কিছুদিন থেকে ভালো রকম পাকড়েছে আমাকে। কখন ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! আমরা যারা এই পৃথিবীর মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা সবাইকেই একদিন চলে যেতে হয় নির্দিষ্ট সময়ের হিসেবে। জানতাম।
           স্বপ্ন দেখলাম, একটা অন্য পৃথিবী, ভীষন সুন্দর। ঠিক এক্কেবারে আমাদের পৃথিবীর মতই, তবে অন্য জগতে যেখানে সময় ফুরোলেও কাউকে কোথাও যেতে হয় না। যেখানে একটা সময় হলেই সবাই এক একটা কবিতা হয়ে ফুটে ওঠে। সেই জগতে কিছু গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধও আছে। তবে তারা একটু কঠিন গোছের বুদ্ধিমান হবেন, কে যেন বললে! ছোটো ছোটো প্রজাপতির মত রঙীন পাখায় ভীড় করেছে বেশকিছু অণু পরমাণুগল্পও। কয়েকটি ছবি পাখির মত, নীলাকাশে পাখা মেলে উড়ছে।
           কী সুন্দর সাজানো এই নতুন পৃথিবী! অবাক আমি! মুগ্ধ সম্পূর্ণরূপে। আনন্দে আত্মহারা!
           ঘুমটা ভেঙে গেল! হাতে আমার অনেক নতুনবই, পড়ছিলাম। এখন আমি কি করি?

Monday, 18 December 2017

সৌজন্যে- ফিরে দেখা (Retrospect....(feeling glad)

সৌজন্যে- ফিরে দেখা (Retrospect....feeling glad)

     দৈনন্দিন নানা কাজের মধ্যেই এক এক সময় মনে হয় কি যেন বলার ছিল, হয়ত করার ছিল কিছু কিম্বা কারও আসার কথা অথবা আমারই কোথাও যাওয়ার ছিল? কেউ কোনো কাজের কথা বলে রেখেছিল নয়ত আমি কাউকে কোনো কাজের কথা বলেছিলাম? এমন অসংখ্য ভাবনা একসময় মাথার মধ্যে ঘোঁট পাকিয়ে একেবারে ভজগোবিন্দ অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাকে
     মাঝে মধ্যেই, হঠাৎ! ওদিকে, সংসারে হাজার কাজকর্ম
     কি করি? বড্ড অসহায় বোধ হয়নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগে। চোখের সামনে আকাশভরা ধোঁয়াশার মেঘ। মনের মধ্যে বুক-ধড়পড় দ্বন্দ্ব। চোখেমুখে বোকা বোকা অস্থিরতা।

     এইসময় কি উচিৎ কিম্বা কি উচিৎ নয় ভেবে উঠতে পারি না।

     মাপ চাইছি এইক্ষণে অবস্থার গুরুত্ব বুঝাইতে সাধুভাষার শরণাপন্ন হইলাম।

     একদিবস এমনই ভেবলু মনোকষ্টে বেতারযন্ত্রটির প্রতি আকর্ষিত হইলামসেইক্ষণে যন্ত্রটিকে হস্তে তুলিয়া জোরপুর্বক তাহার কর্ণমুল আন্দোলিত করিতে লাগিলামপ্রবল শোঁশোঁ শব্দে সে তাহার আপত্তি জানাইলতাহার আপত্তিতে পাত্তা না দিয়া এইদিক ওইদিক ঘুরাইয়া ফিরাইয়া মন ভালো করিবার সামগ্রী অনুসন্ধান করিতে থাকিলাম
     এবং সেইহেতু ক্রমাগত তাহার কর্ণমুল মর্দন করিতে লাগিলাম বীরদর্পে। কোনোপ্রকার আপত্তি শুনিলাম না, বরঞ্চ তাহা কর্তৃক সমস্তপ্রকার প্রতিরোধকে অস্বীকার করিতে থাকিলামআমি যে তাহা হইতে অধিক শক্তিশালী, তাহা সঠিকভাবে বুঝাইয়া দিতে তৎপর হইলাম সেইক্ষণে
     কোনোপ্রকার বিনষ্ট করিবার অভিপ্রায় আমার আদপেই ছিল না, সেইহেতু অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আরও কিছুসময় ব্যয় করিলাম অনতিবিলম্বে বিফল মনোরথ হইয়া সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলাম। অতঃপর কিংকর্তব্য?

      চারিপার্শ্বে দৃষ্টিপাত করিলাম। গৃহে সকলই আধুনিক যন্ত্রপাতি। সংসারের দূরদর্শনে, শ্রুতি শ্রবণের বৃহৎ পরিবারে, দর্শনীয় সামগ্রীতে এমনই নানাবিধ কাড়া-নাকাড়া বাজিতে থাকে সর্বদা সময় এবং মেজাজ ধ্বংসের বিশালসম্ভার। অন্ধ অনুকরণীয় সজ্জা
      তাহাদের উপর শক্তিপ্রয়োগ করিলে অধিক অর্থদন্ড স্বীকার করিতে হইবে। অবশ্যম্ভাবীরূপে সমুচিৎ হইবে না। মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ প্রসূত প্রবলতম জ্ঞান মুহূর্তে আমাকে সতর্ক করিয়া দিল। বুঝিলাম, সংসারে সম্পূর্ণ বিনষ্ট হই নাই আমি!
      অতএব অতীব আহ্লাদপুর্বক আনন্দিতচিত্তে অনুসন্ধিৎসু চক্ষুদ্বয়কে এইদিক ওইদিক সন্ধান কার্যে কিছুসময় ব্যপৃত রাখিলাম। হেনকালে বহুদিনের পুরাতন একটি পুজাসংখ্যা গোচরে আসিল। তৎক্ষণাৎ হস্তে লইয়া ধুলি আচ্ছাদন হইতে মুক্ত করিতে সচেষ্ট হইলাম। প্রতিটি পৃষ্ঠার উপর প্রায় সম্পূর্ণরূপে অবনত হইয়া মনোভার লাঘব করিবার উপাদান খুঁজিয়া বেড়াইতে থাকিলাম
      পত্রিকাটি একটি সৌজন্যসংখ্যা। সম্পাদকের নিকট হইতে কতক উচ্ছসিত প্রশংসাবাক্য সহযোগে উপহার স্বরূপ প্রাপ্তি। কোনো কারণে পরবর্তীকালে সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। নামটিও ভুলিয়াছিলাম, মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থে কিছুক্ষণ আলোড়ন করিয়া অর্থাৎ কিছুসময় ব্যয় করিয়া স্মরণে আনিলাম  
      স্মরণে আসিল আরও অসংখ্য আনন্দক্ষণ, আলোকিত অতীত দেখিলাম, আমার রচিত একখানি গল্পও রহিয়াছে। মুগ্ধ হইলাম, অশ্রুবাস্পে রুদ্ধ হইলাম এবং আশ্চর্যান্বিত হইলাম অতীতে আমাকর্তৃকই এ হেন সৃষ্টি হইয়াছিল!  
      নিজের নিজস্বতাকে অর্থাৎ স্বরূপ বুঝিতে সকলকেই পরিশ্রম করিতে হয়এবং সেই অভিপ্রায়ে আত্মহারা আমি তাহাতে নিমগ্ন হইয়া জগৎ সংসার বিস্মৃত হইলাম।

      সময় সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতক আমিও দীর্ঘসময় বহাইয়া দিলাম আমারই অলক্ষ্যে। ভুলিলাম, সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম আমারই অপেক্ষায় রহিয়াছে।

       অতঃপর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে বাধ্য হইলাম যে, আধুনিকতার দোহাই দিয়া যতই আমরা অগ্রগতির নেশায় দৌড়াইয়া চলি কিম্বা যতই দৌড়াক জগৎসংসার, তবুও এইপ্রকার সামগ্রী ফিরিয়া দেখিতে যে অভুতপূর্ব আনন্দ হয় তাহা অতুলনীয়
 
      এবং যেকোনো অত্যাধুনিক বিলাস বিষয়ক বিস্ময়কর যন্ত্রপাতি হইতে নহে, একান্ত সাধারণ কাগজ-কলম-মন নির্ম্মিত সাধারণ পুজাসংখ্যা হইলেও হইতেও পারেযাহাতে বহুসংখ্যক সাহিত্যপ্রেমী ভাবনা-চিন্তায় সময়ের দলিল অঙ্কিত করিয়াছেন। যাহার সৌজন্যে এই অমূল্য সম্পদ আহরিত করিয়াছি সাময়িক তাহাকে বিস্মৃত হইলেও তাহারই সৌজন্যে নির্ভর করিয়া সংসারের অসার সময় এবং তাহা হইতে প্রাপ্ত কিঞ্চিৎ মনোভার কমাইতে পারিলাম সানন্দে

                        ------

Friday, 1 December 2017

উপলব্ধি (Likely to feel some...)

                উপলব্ধি (Likely to feel some...)

   বড় অসহায় লাগে! এই জীবনটাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে জীবন তো ফুরিয়ে এল। অথচ কিছুই বোঝা গেল না, কোথা দিয়ে সময় চলে যায়!

    সেদিনেও বুঝতাম না! এখনও বুঝছি না! বেশ আছি, দিব্যি আছি। হাসছি, খেলছি, নাচছি, গাইছি। এভাবেই আনন্দে মজায় বেশ কাটছে সময়। কাটবে পরেও!
উপরওয়ালা ছপ্পড় ফুড়েই দিচ্ছেন, নো ভাবনা-চিন্তা, ডু আড্ডা-ফুর্তীমাঝে মধ্যে চলতে ফিরতে পেন্নাম ঠুকিউপরওয়ালা নির্ঘাৎ বর্তে যান এমন ভক্তি পেয়ে।

  ছুটে চলেছি, চলছি হেঁটে, উড়েও চলি যখন তখন দেদার অবকাশ জীবনে, আনন্দ উপভোগ করিএদিক ওদিক তাকানোর সময় কই! কুঁড়ে, অলস, যারা কাজেকর্মে অসফল, তারা ঘরে বসে হা-হুতাশ করে তাদের দলে নাম লেখাব না। বরং, সব্বাইকে ডাক দিই। এস, এস, বাইরে বেরোও! চারদেওয়ালের সঙ্কীর্ণতা ছেড়ে পথে নামো। দেখবে, হাজার হাজার সফল মানুষ তোমার সঙ্গে রয়েছেন
  কুঁড়েমী করে ঘরে কম্বলমুড়ি দিয়ে গুটিয়ে থাকলে চলবে না।
  এক কদম এগিয়ে এস তুমি, আমরা তোমাকে দু’কদম এগিয়ে দেব।
  মন খারাপ বলে অন্ধকারে মুখ লুকোলে কেউ কি তোমার মন ভালো করে দিতে পারবে! মনটাকে ভালো রাখতে হলে যে মনের আলো জ্বেলে নিতে হবে নিজেকেই।

  এমন কতশত উপদেশ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে, অথচ কাজে তো লাগল না!

  এইজগতে সময় থাকতে সময়ের মূল্য বোঝে কতজন?

  পস্তাতে পস্তাতে দিন যায়, এগিয়ে চলি আরোও শেষের দিকে এগিয়ে!

আলোর বৃত্তের বাইরে এমন ভয়ঙ্কর অন্ধকার থাকে কখনও বুঝতে পারিনি আগে!
উপরওয়ালা যখন দেন ছপ্পড় ফুড়েই দেন। যেমন আনন্দ, তেমন দুঃখও! যেমন খুশির উপহার, তেমনি আঘাতের কষ্টও! নতুন জীবন দিচ্ছেন যেমন, তেমনই জীবন কেড়ে নিচ্ছেন মুহূর্তে! কে বুঝবে তোমার স্বরূপ, হে ঈশ্বর!

আমরা সামান্য মানুষ, তোমাকে বোঝাতে এতবড় আঘাত না দিতেও পারো তো?

   তবে একটু যেন উপলব্ধি জাগছে, সবটাই বুঝি বিফলে যায় না জীবনে!
ভিক্ষা যদি চাইতে হয়, তোমার কাছেই চাই হে ঈশ্বর, যেন বুঝতে পারি সহজেই। তোমাকে যেন দেখতে পাই আলোর মত, তোমাকে যেন চিনতে পারি জলের মত। তোমাকে যেন খুঁজে পাই বন্ধুসখার মত, তোমাকে যেন শিখতে পারি সময়ের মত।
                                   ------

    

Tuesday, 7 November 2017

মানবজমীন (Great Value Of Life)



                                মানবজমীন(Great Value Of Life)
                                

ত জন্মের সাধনায় এই মানুষ জন্ম লাভ, একে কী নষ্ট করতে হয় এমন যা তা ভাবে? যদিও আমাদের প্রত্যেকের জীবনবোধ আলাদা। পরিবেশ, পরিস্থিতি, এমন কি প্রত্যেকের মনের গড়নও আলাদা। আলাদা ভাবনা চিন্তা, আলাদা বিচার বিবেচনা, আলাদা ভাবেই তুল্যমুল্য বিচার বোধে পাল্টে যায় মুল্যবোধও! তবে, সবাই তো আমরা মানুষ! এই আশ্চর্যসুন্দর বৃহৎ পৃথিবীর সভ্য দেশের নাগরিক। কিছু কিছু সাধারণ বিষয়ে তো একমত হতেই হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের সকলেরই সামাজিক দায়বদ্ধতা কিছু থাকবেই। বাসস্থানে, কর্মস্থলে, রাজ্যে, রাষ্ট্রে এবং বিশ্বের প্রয়োজনে প্রত্যেকেরই যে কমবেশি কিছু ভুমিকা থাকে তা স্মরনে রাখতে হবে প্রত্যেককেই।
    না! আমি জ্ঞান বিতরণ করতে বসিনি এই মুহূর্তে, আমার কেবলই মনে হচ্ছে যতই কেন না ব্যস্তসমস্ত হয়ে দৌড়ে বেড়াই, তা সত্বেও দিনের মধ্যে একবার হলেও নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো দরকার।
    যা কিছু কাজ করছি সব ঠিক করছি তো? কখনও এমন কিছু করা উচিৎ নয় যাতে মানুষ নামের অর্থ পাল্টে যায় কিম্বা নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে দ্বিধা হয় ক্ষণিকের জন্য, মুহূর্তের জন্য হলেও!
    হয়ত সবাই বলবেন, প্রত্যেকের জীবনেই কতশত হাজার সমস্যা! কিন্তু সেইসব সমস্যার সমাধানও তো হাজারের বেশি থাকে। যদিও অনেকসময় আমাদের চোখের সামনে অনেক মায়া-বিভ্রম ভেসে ওঠে, যা হয়ত বাস্তব সত্যের বিপরীতে অবস্থান করে! চকচকে জৌলুসে চোখে ধাঁধা লাগে, ক্ষীনকায় সত্যের চেহারা চোখ এড়িয়ে যায় অজান্তেই। এবং তা হলেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস সবাই সেসব কথা বোঝেনও যথাযথ। তবুও, অর্থাৎ কখনও কখনও বুঝেও আমরা অনেক কিছু না বোঝার ভাণ করিকেন? কেন করি নিজের সঙ্গে নিজের এমন লুকোচুরি খেলা? 
    হয়ত ফিরে দেখা হয় না নিজেকে কিছুতেই! হয়ত পাশ কাটিয়ে পালাতে চাই সন্তর্পণে, হয়ত অনায়াসে পাওয়া নিজের এই জীবনটার পরিপূর্ণ মুল্য বুঝতে মুশকিল হয়, কিংবা আমরা এত জটিলতায় নিজেকে রাখতে ভালোবাসি না! 
                                                                                                   
     তবুও আজ বলব, এই মানব জীবন অত্যন্ত দামী, দয়াকরে অযথা নষ্ট করবেন না.... এই আমার  একান্ত অনুরোধ, বিনম্র আবেদন রাখি সকলের কাছে। কি? এখন একটু হলেও ভাববেন তো?

Saturday, 30 September 2017

খোলা জানালা (Open Window)

                                    খোলা জানালা
                   পূর্ণপ্রভা ঘোষ

           জ কোন তিথি? মেঘের গায়ে বিশাল চাঁদ উঠেছে। সারাদিনের বৃষ্টিতে মেজাজটা ভিজে ঝুপ্পুসযতবারই জ্বলে উঠবে ভাবে ততবারই চুপসে ঠান্ডা। একরাশ রূপের ডালি নিয়ে সুন্দরী চাঁদ এখন হাজির। রাগ-বিতৃষ্ণা অনুরাগে বদলায় কি? গা ঝাড়া দেয় সুকান্ত।
             জানালাটা খোলা থাকে সারাক্ষণএইঘরে একটাই জানালা। বন্ধ করলে দম আটকে মরবেএখন ঝামেলা জানালাটাকে নিয়েই  গলির বাড়িগুলো গায়ে গা ঠেকিয়ে। সব বাড়িতে অনেক মানুষের বাস। হাতপা ছড়িয়ে থাকত এককালে। ক্রমশ সংসার বেড়েছে, বেড়েছে লোকসংখ্যাওঅনেকদিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে সয়ে যায়মাঝেমাঝে ঝগড়াও লাগে, তবে তেমন নয়। কেউই গায়ে মাখে না। পুকুরের জলে যেন খোলামকুচির ব্যাঙ লাফানো খেলা, তেমনই যাও, কতদূর লাফাবে! তারপর সেই নিস্তরঙ্গএখানে এ'বাড়ি ও'বাড়ি যেতে বাচ্চারা ছাদে ছাদে লাফিয়ে যায়। এতদিন কোনো ঝামেলা ছিলই না।
             ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে পাড়ার চরিত্র। এই পাড়ায় এখন অনেক নতুন মানুষ। নিত্যদিনের অভ্যাসগুলোতে ধাক্কা লাগছে প্রথমে!
             ও বাড়ির সুমি এই বাড়ির ডাবুর সঙ্গে প্রেম করে। সবাই জানে! কতদিন তো ছাদের একান্তে ওদের দুটিকে ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলতে দেখেছে সবাইদুজনকে বেশ মানায়। তাই সুমিকে দেখতে আসা পাত্রপক্ষকে ইচ্ছে করেই কতবার যে অন্য রাস্তা দেখিয়েছে বাচ্চারা।  
         অথচ দুইবাড়ির কেউই এই সম্পর্ক মানবে না ভগবান জানেন কেন! সুমির ভালো চেয়ে দুইবাড়ির অভিভাবকেরা এই সম্পর্ক ভাঙতে বদ্ধপরিকর। সম্ভাব্য সমস্ত পথ বন্ধ করে নিশ্চিন্ত হতে চায়। এই জানালা দিয়ে কথা বলেই দুজনে পালাচ্ছিল কিভাবে যেন ধরা পড়েছে। ব্যস্! সব দোষ জানালার অতএব বন্ধ কর।
             তাহলে সুকান্ত? তার জন্যই জানালা পথে দিনান্তে অন্তত একবার হলেও এসে দাঁড়ায় সূর্য এবং চাঁদ! দুর্ঘটনায় দুইপা হারিয়ে চলচ্ছক্তিহীন সে। তার দুইচোখে এইটুকু বহির্বিশ্ব, একটুকরো প্রাণভ্রমরা। সামান্য একচিলতে অনুরাগের আকাশ তার হৃৎপিন্ড। 
             অথচ তার কথা ভাবে কে! জানালাটাও না! চোখের জলে অস্পষ্ট দৃষ্টিপথ, আবছায়া অন্ধকারে এগিয়ে আসে নিরেট দেওয়াল।  
          হঠাৎ তার মনের মধ্যে অদ্ভুত এক আলোড়ন! চমক লাগে নিজেরই। কতরকমের শুভ ভাবনারা এসে আলোর পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলে তাকে আশ্চর্যভাবে। সে যে মনের মধ্যে শুভশক্তিরই অর্চনা করত সর্বদা। এখন তার সামনে খুলে গেল আরও মস্ত বড় জানালা। 
                                  
                                     _____

                                  

Wednesday, 30 August 2017

(Our Kolkata & We are addabuzz) আড্ডাপ্রিয় আমরা ও আমাদের কলকাতা

                           আড্ডাপ্রিয় আমরা ও আমাদের কলকাতা

          সবে কয়েকবছর হোল কলকাতায় ফিরেছি। এসেই বুভুক্ষের মত ঝাঁপিয়ে পড়ি সব জিনিসের উপর। কলকাতার রাস্তাঘাটে জমাট জ্যাম, কিছুতেই গাড়ি এগোয় না! তার মধ্যেই কেউ কেউ সিগন্যাল উপেক্ষা করে সাঁই সাঁই-ই বেরিয়ে যাচ্ছে ফাঁকে ফোকরে। ফুটপাথে উপর দিয়ে বিনা বাধায় চলাই দায়! দোকান বাজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এদিক ওদিক যে যেদিকে পারে বসে গিয়েছে, সবাই বড্ড অগোছালো! পুরো কলকাতায় মানুষ যেখানে কয়েক কোটি, সেখানে হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র ডিপার্টমেন্টাল স্টোর! তাই সব জায়গাতেই মানুষের ভীড়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত। বোঁও-ও, যেন বোলতার চাকের চারপাশে ঘুরছে বোলতা-মানুষ। কখনও কখনও যেন মনে হচ্ছে মৌমাছির ঝাঁক ধেয়ে আসছে চারদিক থেকে, মানুষে মানুষে ছয়লাপ। এদিকে কোনো প্রয়োজনীয় কাজে এগোতে গেলে দেখা যায় বড্ড আলসেমী সকলের। কাজের মানুষেরা বিকল, প্রায় বিলুপ্ত!
          ওদিকে সব্বাই কিন্তু বক্তিমেতে ওস্তাদ! কোহলি-ধোনি থেকে মহামান্য মন্ত্রীদেরকেও যখন তখন উপদেশ দিতে পারে সব্বাই, অতি জ্ঞানী মানুষজন চারপাশেই! পথের মাঝে যেখানে সেখানে জটলা। অফিসের করিডোরে, পাড়ার মোড়ে, ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা চায়ের দোকানে, রোলের দোকানে, কোথায় নেই মানুষের ভীড়! দু’পা হাঁটতে না হাঁটতে জাঙ্কফুডের পসরা নিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সই, সেখানেও ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ। পাশাপাশি রকমারি লোভনীয় মিষ্টির দোকান, কত মিষ্টি সাজানো। কোথাও এই সুন্দর দোকানের সুদৃশ্য কাঁচের বাইরেই দাঁড়িয়ে ফুচকাওয়ালা। মুচমুচে ফুচকাদের অন্তরে স্বাদিষ্ট মশলা মাখা চটকানো আলু ভরছে ফুচকাওয়ালা, হাঁড়িতে কালো তেঁতুলগোলা জলে ডুবিয়ে তুলে দিচ্ছেন সুবেশা সুন্দরীদের অতৃপ্ত রসনা নিবৃত্ত করতে। ফুচকাওয়ালার পেশাদার নির্লিপ্তি এবং হাঁ-মুখের সুন্দরীদের তৃপ্ত মুখচ্ছবি দেখলে মনে হয় জগতে সব সুখ এখানেই।
          তারপরেই হয়ত শক্তিশালী চুম্বকের মত দুর্বার আকর্ষনে টানছে রঙ বেরঙের শাড়ি। বিভিন্ন ধরণের পোষাকের সম্ভার নিয়ে বিশালাকার শোকেস, মহিলারা চলতে ফিরতে উইন্ডো শপিংয়ে ব্যস্ত। খানিক দূরেই হয়ত রয়েছে অপরিস্কার প্লাস্টিকের ছাউনিতে ফুটপাতের ঘরকন্না। নোংরা ফেলার ভ্যাটের পাশে বাচ্চারা হেসেখেলে দিব্যি বড় হচ্ছে কুকুর বেড়ালের সঙ্গে, তাদের মাবাবাদেরও কোনো অস্বস্তি নেই!
         এ হ্যায় কলকাত্তা, মেরি জান্! বেদখল ফুটপাথ, তাপ্পি দেওয়া রাজপথ! বিপজ্জনক নির্ম্মান।
         যাইহোক না কেন, এ আমাদের কলকাতা ভাই! অতুল্য, হামারে আপনা, সবসে প্যায়ারা।

         কয়েকটা বছর বিহার, ঝাড়খন্ড, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং ভারতের বাইরে থাকতে হয়েছিল কর্তার লেজ ধরে। তখন অবস্থা ছিল ঠিক বিনা জলের মাছের মত। কিন্তু বড়ই আশাবাদী আমি,  নইলে এতগুলো বছর নিজের জায়গা ছেড়ে থাকতে পারতাম না। সেই সময়গুলোতে কতকিছু যে মিস করেছি!  সবচেয়ে বেশি দুঃখু হত আড্ডা এবং বাংলা ভাষার জন্য।

         অনেকদিন আগে একটা বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম।  রাহুল বোস ও রাধিকা আপ্তের।  বাড়ি এসেই পুরোনো সবকিছুতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছি হাভাতের মত। আরে একি? এইসব কি অব্যবস্থা?  মনের কথা বলতে চ্যাট?  ওরে বাবা,  সেদিন বড্ড অদ্ভুত লাগলেও আজকের সময়ে দেখছি এটাই দস্তুর। এই সময়ের, এই যুগের রেওয়াজ। ছোটো থেকে বুড়ো সকলেরই। কারও কাছেই এখন সময় নেই কথা বলার।
         আড্ডা তো দূর অস্ত! মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’টো কথা বলার মানুষ নেই চারপাশে।
         আন্তর্জালের সুব্যবস্থায় পুরো পৃথিবী এখন অন্যভাবে ব্যস্ত। সম্পর্কের মধ্যে,  সমস্ত কাজের মধ্যে, এমনকি জীবনের এ টু জেড সমস্ত প্রয়োজনে সর্বক্ষণ বিশ্বস্ত বন্ধুর মত হাত ধরে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। ইচ্ছে করলে মুহূর্তেই পৃথিবীর এইপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্তের সঙ্গে কথা কিম্বা মুখোমুখিও হওয়া যায়। যদিও তা ডিজিট্যালি,  তা হলেও এভাবেই তো সম্ভব হচ্ছে মনস্কামনা পুরণের। তাহলে অন্যভাবে কে বসবে পুরোনো দিনের মত। এখন যেন সোনার পাথরবাটি, কলকাতা ও বাঙালীর চিরন্তন আড্ডা! 

         আজকাল বেশিরভাগ মানুষ একা থাকতে বাধ্য হচ্ছেন নানা কারণে।
          সেকারণেই মানুষের ডিজিট্যাল নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু সেই অবস্থাও এখন এমন বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে যাতে আমি আপনি সকলেই ভুক্তভোগী। তার কুফলে সকলেই কষ্ট পাচ্ছি সাঙ্ঘাতিক।
          স্বামীস্ত্রী মুখোমুখি হয় কম, হলেও দুজনেরই মুখে কুলুপ আঁটা। একান্ত নিজস্ব কথাগুলো বলতে হলেও মেসেজের মাধ্যমে বলছেন। ছেলেমেয়েরাও মাবাবার সঙ্গে একই পদ্ধতিতে কথা বলে আজকাল।
          সব সম্পর্কের মধ্যেই এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা আজ দিব্যি গড়গড়িয়ে চলছে!
          আজ বিকেলেই টিভি চ্যানেল সার্ফ করতে করতে ডিডি বাংলাতে শান্তিনিকেতন থেকে সম্প্রসারিত নাচের একটি অনুষ্ঠানে আটকে গেলাম,  মুগ্ধ হয়ে দেখছি,  খুব সুন্দর। মাঝে মাঝে দর্শকের দিকে ক্যামেরা যাচ্ছে, একি? অবাক হতভম্ব  দশা আমার!
          সেখানেও দর্শকাসনের প্রায় আশি শতাংশ মানুষ (ছোটো বড় সব বয়সী) কানে ফোন নয়ত ফোনের পর্দায় চোখ রেখে বসে রয়েছেন। দীর্ঘ অনুশীলন এবং প্রচন্ড পরিশ্রমের পর মঞ্চে তখন বিভিন্ন সস্থার ছাত্রছাত্রীরা অপূর্বসুন্দর নয়নমনোহর নৃত্য পরিবেশন করছে আনন্দচিত্তে।

          আমরা আন্তর্জালের মায়ায় এতটাই বিপজ্জনকভাবে জড়িয়ে পড়ছি ক্রমাগত। এই সেদিনেও যেভাবে আড্ডার জন্য প্রাণ আকুল হয়ে উঠত, জীবনের  একটা সময় আড্ডায় বসলে হয়ত পৃথিবীর সমস্ত কিছুকেই ভুলে যেতে মুহূর্ত লাগত না সেই সব কথা হয়ত ইতিহাস হয়ে যাবে ক্রমশ। 
          তবে আশাবাদী আমি চিরকাল,  চিরশাশ্বত ভাবনায় স্বপ্ন দেখি। হবে,  হবে, জমবে  আড্ডা। সেই নির্ভেজাল শৈশব,  কৈশোর,  তারুন্য,  যৌবন, সোনালী দিনের সুসময়ে ধরে রাখবে আমাদের আকুলতা।

          পৃথিবীর বিরাটত্বে, স্বাচ্ছ্যন্দের পরাকাষ্ঠায় আমরা আজকাল মানুষ-রোবট হয়ে যাচ্ছি। একদিন রোবটেরও হয়ত হৃদয় জেগে উঠবে অথচ আমরাই ক্রমশ হৃদয়হীন হয়ে যাচ্ছি। কতশত অমূল্য সম্পদই যে হারিয়ে ফেলছি অবহেলায়, অজ্ঞানতায়, কে তার হিসেব রাখে! এই বেহিসেবী ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই আন্তরিকতার সাথে। তাইতো জীবনের মাঝপথে এসে সচেতনে বলি, ওগো আমাদের এই ভয়ঙ্কর কঠিন শুষ্কমরু জীবনের মরুদ্যানসম আড্ডাকে হারিয়ে যেতে দেব না কিছুতেই।

          তবে, ওইযে সংবাদে পরিবেশিত ফ্যাশনেবল আড্ডা আড্ডা অভিনয়, কিম্বা  দেখনদারী আড্ডা নয়। সত্যিকারে যারা সমমনস্ক আড্ডাপ্রিয় মানুষ, হবই হব একজোট। জমে উঠবে ক্রমশ পৃথিবী ভুলে যাওয়া উত্তাল ছেলেমানুষী বিতর্ক, তারই সঙ্গে চায়ের কাপে আলতো চুমুক দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে অনুভব করব অনেকখানি আন্তরিকতা। কলকাতার ফুটপাথ থেকে অনেকদিনের পোড়াকালো গরম তেল থেকে ছেঁকে তোলা আলুর চপ আর পেঁয়াজীতে কামড় দিয়ে জিভ পুড়িয়ে আঃ-উঃ করতে করতেই খোঁজ নেব কার ছেলে ইউনিভার্সিটিতে কোন সেমিস্টার করছে, খবর দেব আমাদের কার মেয়ে এবার নাচের প্রতিযোগিতায় গোল্ড মেডেল পেয়েছে। কার লেখা কবিতা লিটলম্যাগে ছাপা হয়েছে খবর নেব, উৎসাহ দেব যার ভালো প্রবন্ধ লেখার হাত ছিল, আবার শুরু কর না বলে! হয়ত একই সঙ্গে কোন বন্ধুর বিয়ে ভেঙে যাওয়ার গল্প শুনব, আবার কাউকে হয়ত নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখাব। ভালোবাসার অহঙ্কারে হয়ত জমিয়ে পতিনিন্দা জুড়ব শতমুখে।  
         সেদিনের সেই একান্নবর্তী পরিবার আজ নেই। কোনো না কোনো বাহানায় একসঙ্গে পাত পেড়ে খেতে বসার দৃশ্যও বেমালুম গায়েব। তাই খাওয়ার পাতে গল্পে গল্পে এঁটো হাত শুকিয়ে ফেলা এখন শুধুই ইতিহাস। কিন্তু আচমকা বন্ধুদের সঙ্গে ফুটপাথে জড়ো হয়ে পথচলতি লোকজনের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে হাহা হিহি করবই। জমিয়ে একটু খুনসুটি, কাউকে খেপিয়ে দিয়ে  একটু মজা এবং তারপর ..!

         নিজের মনকে বন্ধুদের আঁচলে আলগোছে অনেকখানি ফেলে রেখে আবার শিগ্গির মেলার অঙ্গীকার করব বারংবার। নেহাৎ একটা সময় বাড়ি ফিরতেই হবে শত অনিচ্ছা হলেও। সেই আমাদের ভীড়ের কলকাতা, লাইনের কলকাতার নিয়ম মেনেই অটো কিম্বা বাসের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়াব অনন্তকাল।
         না! সেইসময় কেবল চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকব না, পাশের মানুষটার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ জমে উঠব গল্পে কথায়, একইসঙ্গে খুব কষে গালি দেব কলকাতাকে। যাকে ভালোবাসি তাকে যে প্রতিক্ষণে এভাবেই চাই। তুমি আমার একান্ত আপনজন, সেকথা বোঝই তো! শত অসুবিধে মেনেও মানিয়ে নেব জীবনযুদ্ধে, ভালোবেসে, নিন্দা করেও অলস আড্ডার টানে তাই থাকতে চাই এখানেই, আমাদের কলকাতা।



Sunday, 23 April 2017

মুখোমুখি ( I'm, Face to Face)

                              মুখোমুখি
                             পূর্ণপ্রভা ঘোষ

‘খুব যে ভেবেচিন্তে কথা বলি আমি, তা নয়! আসলে আমি কথা বলতে ভালোবাসি। কারণে অকারণে সারাক্ষণই কথা বলি। শ্রোতা সামনে থাকলে ভালো, নইলে কুছ পরোয়া নেহি। দূরের মানুষ, অলক্ষ্যের মানুষ, চেনা কিম্বা অচেনা! এমনকি গাছ, ফুল, পাখি, গরু, কুকুর যে কেউ হোক, আমি কথা বলার জন্য উদগ্রীব থাকি। নিশ্চয়ই পাগল ভাবলেন? উঁহু, একেবারেই না।’ হাতে তুলি, ক্যানভাসে স্থিরদৃষ্টি।
     অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছি আমি। হেসে উঠলেন শিশুসুলভ সহজ ছন্দে। অপার্থিব এক আলোর ঝিলিক ছুঁয়ে গেল চারপাশেবলে চলেছেন বিরামহীন, অনর্গল। হয়ত অকেজো কথা তবুও শুনতে বেশ ভালোই লাগছিলআমি মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম চারপাশ আর কানপেতে শুষে নিচ্ছিলাম সমস্ত শব্দরাশি।
     গতকাল এসেছি আমরাসংখ্যায় হাফডজন, ভ্রমণপিপাসুর দল। সারাবছর কর্মচক্রে কলুর বলদের মত চোখ কান বন্ধ করে দৌড়োতে থাকি। টার্গেট, টার্গেট! আরও বেশী, আরও বেশী। চাহিদারও শেষ নেই।
      তবে হাজারও বাধা সরিয়ে এই তিনটে দিন আমরা দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ি প্রকৃতির আঁচল ছুঁতে। মাটির টান, সবুজের মোহ, নীলাকাশের উদারতাগাধার খাটুনি খাটা কয়েকটি মার্কেটিংয়ের চাকর আমাদের দলে নিজেদের পরিবারকেও রাখি না। আর যারা এখনও যুগল হতে পারেনি তারা তো একাই
      আমরা খুব ভালো বন্ধু। যদিও প্রকৃত বন্ধুত্ব কিছুতেই সম্ভব নয়, জানিতবুও একসঙ্গে গলা মিলিয়ে হা-হা হেসে উঠি, গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে চিয়ার্স করি, অন্যের বউয়ের বেঢপ স্ট্যাটিস্টিকস্ জেনেও ঝুটমুট প্রশংসা করি, আমরা পাক্কা অভিনেতা। বন্ধুত্বেরও অভিনয় করি।
       যাক গে সেসব! বছরে এই তিনটে দিন মিথ্যে বন্ধুত্বের জন্য উৎসর্গ করি। কাল সারাদিন হোটেলের লনেই কাটিয়েছিদলে গোটা দুয়েক বাচ্চা আছে, তারা দুদুভাতু। মায়ের আঁচল থেকে সবে বেরিয়েছে, মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মিলে উড়ে বেড়াচ্ছে আনন্দে। কোনো বাধা নেই। এইটুকু স্বাধীনতার লোভেই তো বেরোনো।
       আজ সকালে সবাই সাইট সিইংয়ে গেছে দলবেঁধে। আমি একা দলছুট। শরীর খারাপের মিথ্যে নাটকে ওরা বিশ্বাস করে আমায় ছেড়ে দিয়েছে। ঝাঁকের কই হওয়ার যন্ত্রনা থেকে রেহাই মিলেছে আমার। গতকালই দেখেছিঅপেক্ষায় ছিলাম, কৌতুহল নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে এইটুকু মিথ্যের আশ্রয় নিতেই হল।
                         
       হোটেলের অদূরেই, ছোট্ট একটা মাটির চালাঘর। উন্মুক্ত দাওয়াতে দশ বাই দশের বিশাল ক্যানভাস। শিল্পকর্মে আত্মনিমগ্ন শিল্পী, দাঁড়ালাম এসে নিঃশব্দে। একবারও ঘুরে তাকালেন না। কিন্তু অভ্যর্থনা জানালেন।
       তারপর থেকেই বিরামহীন কথার স্রোত। হাতের তুলি চলছে অক্লান্ত। রঙের ভারসাম্য রেখে এগোচ্ছে ছবিটা, নির্ভরযোগ্য প্রাণময়তার সন্ধানে।
       ঘন্টা পাঁচ ছয় সময় কিভাবে পেরিয়ে গেলএকবারও আমার মুখে চোখ ফেলেননি শিল্পী। অথচ কতকথাই হচ্ছে দুজনের। পরিচয়, পছন্দ অপছন্দ, ভালো লাগা মন্দ লাগা। আমাদের দলের সবাই সন্ধের আগে ফিরবে না। হাতে এখনও ঘন্টা খানেক রয়েছে।
       ঘুরে দাঁড়ালেন শিল্পী, চমকে উঠলাম।
       হাল্কা নরম মায়াময় আলো পড়েছে ছবির উপর। পশ্চিম আকাশে সূর্য এখনও বিদায় নেয়নি। মিটিমিটি হাসছেন শিল্পী। খুব চেনা লাগছে, কিছুতেই মনে করতে পারছি না। হাল্কা দাঁড়িগোঁফের আড়ালে হাসিটা ভীষন আকর্ষনীয়। কিন্তু কে? আমার খুব চেনা, খুবই চেনা। অথচ স্মৃতিটা এইমুহূর্তে বিশ্বসঘাতকতা করছে।
       কিছুক্ষণ মাথা ঘামিয়ে হাল ছেড়ে দিলাম। স্রষ্টাকে ছেড়ে সৃষ্টির দিকে তাকাই। ওকে? মাথাটা বোঁও করে চক্কর দিল! টাল সামলাতে না পেরে পড়েই যাচ্ছি। হাত বাড়িয়ে পতন আটকে দিলেন উনিরক্ষা পেলাম ধরনীতলে শয্যা গ্রহণের আগে। কিন্তু? এসব কি ঘটছে?
        ক্যানভাস জুড়ে প্রমাণ সাইজের আমি, হ্যাঁ, আমিই তো। কম বয়সের হাসিমাখা মুখ। কবে এমন হাসতাম? কবে? অতীতে? হাসতে জানতাম? পারতাম? কিন্তু আমাকে কিকরে আঁকলেন? আমায় চেনেন? তাহলে উনি কে?
        রঙতুলি হাতে নিয়ে তাকিয়ে আছি অপলকে, আমিই তো! হাসিমুখেই। ভবিষ্যতের আমি! কয়েক বছর পেরিয়ে!


                              ----------