আড্ডাপ্রিয় আমরা ও আমাদের কলকাতা
সবে কয়েকবছর হোল কলকাতায় ফিরেছি। এসেই বুভুক্ষের
মত ঝাঁপিয়ে পড়ি সব জিনিসের উপর। কলকাতার রাস্তাঘাটে জমাট জ্যাম, কিছুতেই গাড়ি এগোয়
না! তার মধ্যেই কেউ কেউ সিগন্যাল উপেক্ষা করে সাঁই সাঁই-ই বেরিয়ে যাচ্ছে ফাঁকে
ফোকরে। ফুটপাথে উপর দিয়ে বিনা বাধায় চলাই দায়! দোকান বাজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এদিক
ওদিক যে যেদিকে পারে বসে গিয়েছে, সবাই বড্ড অগোছালো! পুরো কলকাতায় মানুষ যেখানে
কয়েক কোটি, সেখানে হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র ডিপার্টমেন্টাল স্টোর! তাই সব জায়গাতেই
মানুষের ভীড়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত। বোঁও-ও, যেন বোলতার চাকের চারপাশে ঘুরছে বোলতা-মানুষ।
কখনও কখনও যেন মনে হচ্ছে মৌমাছির ঝাঁক ধেয়ে আসছে চারদিক থেকে, মানুষে মানুষে ছয়লাপ। এদিকে
কোনো প্রয়োজনীয় কাজে এগোতে গেলে দেখা যায় বড্ড আলসেমী সকলের। কাজের মানুষেরা বিকল,
প্রায় বিলুপ্ত!
ওদিকে সব্বাই কিন্তু বক্তিমেতে ওস্তাদ!
কোহলি-ধোনি থেকে মহামান্য মন্ত্রীদেরকেও যখন তখন উপদেশ দিতে পারে সব্বাই, অতি জ্ঞানী
মানুষজন চারপাশেই! পথের মাঝে যেখানে সেখানে জটলা। অফিসের করিডোরে, পাড়ার মোড়ে, ব্যাঙের
ছাতার মত গজিয়ে ওঠা চায়ের দোকানে, রোলের দোকানে, কোথায় নেই মানুষের ভীড়! দু’পা
হাঁটতে না হাঁটতে জাঙ্কফুডের পসরা নিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সই, সেখানেও ঝাঁকে ঝাঁকে
মানুষ। পাশাপাশি রকমারি লোভনীয় মিষ্টির দোকান, কত মিষ্টি সাজানো। কোথাও এই সুন্দর দোকানের
সুদৃশ্য কাঁচের বাইরেই দাঁড়িয়ে ফুচকাওয়ালা। মুচমুচে ফুচকাদের অন্তরে স্বাদিষ্ট
মশলা মাখা চটকানো আলু ভরছে ফুচকাওয়ালা, হাঁড়িতে কালো তেঁতুলগোলা জলে ডুবিয়ে তুলে দিচ্ছেন
সুবেশা সুন্দরীদের অতৃপ্ত রসনা নিবৃত্ত করতে। ফুচকাওয়ালার পেশাদার নির্লিপ্তি এবং
হাঁ-মুখের সুন্দরীদের তৃপ্ত মুখচ্ছবি দেখলে মনে হয় জগতে সব সুখ এখানেই।
তারপরেই হয়ত শক্তিশালী চুম্বকের মত দুর্বার
আকর্ষনে টানছে রঙ বেরঙের শাড়ি। বিভিন্ন ধরণের পোষাকের সম্ভার নিয়ে বিশালাকার শোকেস,
মহিলারা চলতে ফিরতে উইন্ডো শপিংয়ে ব্যস্ত। খানিক দূরেই হয়ত রয়েছে অপরিস্কার
প্লাস্টিকের ছাউনিতে ফুটপাতের ঘরকন্না। নোংরা ফেলার ভ্যাটের পাশে বাচ্চারা
হেসেখেলে দিব্যি বড় হচ্ছে কুকুর বেড়ালের সঙ্গে, তাদের মাবাবাদেরও কোনো অস্বস্তি
নেই!
এ হ্যায় কলকাত্তা, মেরি জান্! বেদখল
ফুটপাথ, তাপ্পি দেওয়া রাজপথ! বিপজ্জনক নির্ম্মান।
যাইহোক না কেন, এ আমাদের কলকাতা ভাই! অতুল্য,
হামারে আপনা, সবসে প্যায়ারা।
কয়েকটা বছর বিহার, ঝাড়খন্ড, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং
ভারতের বাইরে থাকতে হয়েছিল কর্তার লেজ ধরে। তখন
অবস্থা ছিল ঠিক বিনা জলের মাছের মত। কিন্তু বড়ই আশাবাদী আমি, নইলে এতগুলো বছর নিজের জায়গা ছেড়ে থাকতে
পারতাম না। সেই সময়গুলোতে কতকিছু যে মিস করেছি! সবচেয়ে
বেশি দুঃখু হত আড্ডা এবং বাংলা ভাষার জন্য।
অনেকদিন আগে একটা বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম। রাহুল বোস ও রাধিকা আপ্তের। বাড়ি এসেই পুরোনো সবকিছুতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছি হাভাতের মত। আরে একি? এইসব কি অব্যবস্থা? মনের কথা বলতে চ্যাট? ওরে বাবা, সেদিন বড্ড অদ্ভুত লাগলেও আজকের সময়ে দেখছি এটাই দস্তুর। এই সময়ের, এই যুগের রেওয়াজ। ছোটো থেকে বুড়ো সকলেরই। কারও কাছেই এখন সময় নেই কথা বলার।
আড্ডা তো দূর অস্ত! মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’টো
কথা বলার মানুষ নেই চারপাশে।
আন্তর্জালের সুব্যবস্থায় পুরো পৃথিবী এখন অন্যভাবে ব্যস্ত। সম্পর্কের মধ্যে, সমস্ত কাজের মধ্যে, এমনকি জীবনের এ টু জেড সমস্ত প্রয়োজনে সর্বক্ষণ বিশ্বস্ত বন্ধুর মত হাত ধরে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। ইচ্ছে করলে মুহূর্তেই পৃথিবীর এইপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্তের সঙ্গে কথা কিম্বা মুখোমুখিও হওয়া যায়। যদিও তা ডিজিট্যালি, তা হলেও এভাবেই তো সম্ভব হচ্ছে মনস্কামনা পুরণের। তাহলে অন্যভাবে কে বসবে পুরোনো দিনের মত। এখন যেন সোনার পাথরবাটি, কলকাতা ও বাঙালীর চিরন্তন আড্ডা!
আন্তর্জালের সুব্যবস্থায় পুরো পৃথিবী এখন অন্যভাবে ব্যস্ত। সম্পর্কের মধ্যে, সমস্ত কাজের মধ্যে, এমনকি জীবনের এ টু জেড সমস্ত প্রয়োজনে সর্বক্ষণ বিশ্বস্ত বন্ধুর মত হাত ধরে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। ইচ্ছে করলে মুহূর্তেই পৃথিবীর এইপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্তের সঙ্গে কথা কিম্বা মুখোমুখিও হওয়া যায়। যদিও তা ডিজিট্যালি, তা হলেও এভাবেই তো সম্ভব হচ্ছে মনস্কামনা পুরণের। তাহলে অন্যভাবে কে বসবে পুরোনো দিনের মত। এখন যেন সোনার পাথরবাটি, কলকাতা ও বাঙালীর চিরন্তন আড্ডা!
আজকাল বেশিরভাগ মানুষ একা থাকতে বাধ্য হচ্ছেন নানা কারণে।
সেকারণেই মানুষের ডিজিট্যাল নির্ভরতা বাড়ছে।
কিন্তু সেই অবস্থাও এখন এমন বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে যাতে আমি আপনি সকলেই
ভুক্তভোগী। তার কুফলে সকলেই কষ্ট পাচ্ছি সাঙ্ঘাতিক।
স্বামীস্ত্রী মুখোমুখি হয় কম, হলেও
দুজনেরই মুখে কুলুপ আঁটা। একান্ত নিজস্ব কথাগুলো বলতে হলেও মেসেজের মাধ্যমে বলছেন।
ছেলেমেয়েরাও মাবাবার সঙ্গে একই পদ্ধতিতে কথা বলে আজকাল।
সব সম্পর্কের মধ্যেই এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা আজ দিব্যি গড়গড়িয়ে চলছে!
সব সম্পর্কের মধ্যেই এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা আজ দিব্যি গড়গড়িয়ে চলছে!
আজ বিকেলেই টিভি চ্যানেল সার্ফ করতে করতে ডিডি
বাংলাতে শান্তিনিকেতন থেকে সম্প্রসারিত নাচের একটি অনুষ্ঠানে আটকে গেলাম, মুগ্ধ হয়ে দেখছি, খুব সুন্দর। মাঝে মাঝে দর্শকের দিকে
ক্যামেরা যাচ্ছে, একি? অবাক হতভম্ব দশা আমার!
সেখানেও দর্শকাসনের প্রায় আশি শতাংশ মানুষ (ছোটো বড় সব বয়সী) কানে ফোন নয়ত ফোনের পর্দায় চোখ
রেখে বসে রয়েছেন। দীর্ঘ অনুশীলন এবং প্রচন্ড পরিশ্রমের পর মঞ্চে তখন বিভিন্ন
সস্থার ছাত্রছাত্রীরা অপূর্বসুন্দর নয়নমনোহর নৃত্য পরিবেশন করছে আনন্দচিত্তে।
আমরা আন্তর্জালের মায়ায় এতটাই বিপজ্জনকভাবে জড়িয়ে পড়ছি ক্রমাগত। এই সেদিনেও যেভাবে আড্ডার জন্য প্রাণ আকুল হয়ে উঠত, জীবনের একটা সময় আড্ডায় বসলে হয়ত পৃথিবীর সমস্ত কিছুকেই ভুলে যেতে মুহূর্ত লাগত না সেই সব কথা হয়ত ইতিহাস হয়ে যাবে ক্রমশ।
তবে আশাবাদী আমি চিরকাল, চিরশাশ্বত ভাবনায় স্বপ্ন দেখি। হবে, হবে, জমবে আড্ডা। সেই নির্ভেজাল শৈশব, কৈশোর, তারুন্য, যৌবন, সোনালী দিনের সুসময়ে ধরে রাখবে আমাদের আকুলতা।
পৃথিবীর বিরাটত্বে, স্বাচ্ছ্যন্দের
পরাকাষ্ঠায় আমরা আজকাল মানুষ-রোবট হয়ে যাচ্ছি। একদিন রোবটেরও হয়ত হৃদয় জেগে উঠবে অথচ
আমরাই ক্রমশ হৃদয়হীন হয়ে যাচ্ছি। কতশত অমূল্য সম্পদই যে হারিয়ে ফেলছি অবহেলায়,
অজ্ঞানতায়, কে তার হিসেব রাখে! এই বেহিসেবী ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই
আন্তরিকতার সাথে। তাইতো জীবনের মাঝপথে এসে সচেতনে বলি, ওগো আমাদের এই ভয়ঙ্কর কঠিন
শুষ্কমরু জীবনের মরুদ্যানসম আড্ডাকে হারিয়ে যেতে দেব না কিছুতেই।
তবে, ওইযে সংবাদে পরিবেশিত ফ্যাশনেবল আড্ডা আড্ডা অভিনয়, কিম্বা দেখনদারী আড্ডা নয়। সত্যিকারে যারা
সমমনস্ক আড্ডাপ্রিয় মানুষ, হবই হব একজোট। জমে উঠবে ক্রমশ পৃথিবী ভুলে যাওয়া উত্তাল
ছেলেমানুষী বিতর্ক, তারই সঙ্গে চায়ের কাপে আলতো চুমুক দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে অনুভব
করব অনেকখানি আন্তরিকতা। কলকাতার ফুটপাথ থেকে অনেকদিনের পোড়াকালো
গরম তেল থেকে ছেঁকে তোলা আলুর চপ আর পেঁয়াজীতে কামড় দিয়ে জিভ পুড়িয়ে আঃ-উঃ করতে
করতেই খোঁজ নেব কার ছেলে ইউনিভার্সিটিতে কোন সেমিস্টার করছে, খবর দেব আমাদের কার মেয়ে
এবার নাচের প্রতিযোগিতায় গোল্ড মেডেল পেয়েছে। কার লেখা কবিতা লিটলম্যাগে ছাপা
হয়েছে খবর নেব, উৎসাহ দেব যার ভালো প্রবন্ধ লেখার হাত ছিল, আবার শুরু কর না বলে!
হয়ত একই সঙ্গে কোন বন্ধুর বিয়ে ভেঙে যাওয়ার গল্প শুনব, আবার কাউকে হয়ত নতুন করে ঘর
বাঁধার স্বপ্ন দেখাব। ভালোবাসার অহঙ্কারে হয়ত জমিয়ে পতিনিন্দা জুড়ব শতমুখে।
সেদিনের সেই একান্নবর্তী পরিবার আজ নেই।
কোনো না কোনো বাহানায় একসঙ্গে পাত পেড়ে খেতে বসার দৃশ্যও বেমালুম গায়েব। তাই খাওয়ার
পাতে গল্পে গল্পে এঁটো হাত শুকিয়ে ফেলা এখন শুধুই ইতিহাস। কিন্তু আচমকা বন্ধুদের
সঙ্গে ফুটপাথে জড়ো হয়ে পথচলতি লোকজনের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে
হাহা হিহি করবই। জমিয়ে একটু খুনসুটি, কাউকে খেপিয়ে দিয়ে একটু মজা এবং তারপর ..!
নিজের মনকে বন্ধুদের আঁচলে আলগোছে অনেকখানি ফেলে
রেখে আবার শিগ্গির মেলার অঙ্গীকার করব বারংবার। নেহাৎ একটা সময় বাড়ি ফিরতেই হবে শত
অনিচ্ছা হলেও। সেই আমাদের ভীড়ের কলকাতা, লাইনের কলকাতার নিয়ম মেনেই অটো কিম্বা
বাসের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়াব অনন্তকাল।
না! সেইসময় কেবল চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকব
না, পাশের মানুষটার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ জমে উঠব গল্পে কথায়, একইসঙ্গে খুব কষে গালি দেব
কলকাতাকে। যাকে ভালোবাসি তাকে যে প্রতিক্ষণে এভাবেই চাই। তুমি আমার একান্ত আপনজন,
সেকথা বোঝই তো! শত অসুবিধে মেনেও মানিয়ে নেব জীবনযুদ্ধে, ভালোবেসে, নিন্দা করেও অলস আড্ডার টানে তাই থাকতে চাই এখানেই, আমাদের কলকাতা।